জুলাই সনদ ২০২৫ : বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কারের নতুন দিকনির্দেশনা
ভূমিকা
বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক অভিযাত্রায় ২০২৫ সালের জুলাই সনদ একটি ঐতিহাসিক মাইলফলক। দীর্ঘ রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা, স্বৈরতন্ত্র, দলীয়করণ, মানবাধিকার লঙ্ঘন এবং প্রশাসনিক বিশৃঙ্খলার পটভূমিতে এই সনদ রাষ্ট্রকে নতুন কাঠামোয় রূপান্তরের প্রতিশ্রুতি বহন করে। জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের নেতৃত্বে ২৫টি রাজনৈতিক দলের আলোচনার ভিত্তিতে গঠিত এই সনদ রাষ্ট্রসংস্কার, গণতান্ত্রিক পুনর্গঠন ও জনকেন্দ্রিক প্রশাসনের লক্ষ্যে গুরুত্বপূর্ণ নীতিমালা তুলে ধরে।
ঐতিহাসিক পটভূমি
বাংলাদেশের রাষ্ট্রগঠন ও জাতিরাষ্ট্রিক চেতনার শেকড় ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ থেকে উৎসারিত হলেও স্বাধীনতার পর দীর্ঘ ৫৩ বছরেও বহু কাঙ্ক্ষিত গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায়নি। নানা সময় একদলীয় আধিপত্য, সামরিক শাসন ও সংবিধান লঙ্ঘন রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক ভিত্তিকে দুর্বল করে। বিশেষ করে ২০০৯–২০২৪ সাল পর্যন্ত রাষ্ট্রীয় দমন–পীড়ন, বিচারবহির্ভূত হত্যা, দুর্নীতি ও দলীয়করণের অভিযোগ তীব্রতর হয়। এর বিরুদ্ধে ছাত্র–জনতার ধারাবাহিক আন্দোলনের চূড়ান্ত রূপ ছিল ২০২৪ সালের জুলাই–আগস্টের গণঅভ্যুত্থান।
গণঅভ্যুত্থান ও অন্তর্বর্তী সরকার
জুলাই বিপ্লবের মাধ্যমে স্বৈরাচারী সরকারের পতনের পর রাষ্ট্র পুনর্গঠনের লক্ষ্যে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠিত হয়। প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন মুহাম্মদ ইউনূস। তিনি রাষ্ট্রের মৌলিক সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করে বিভিন্ন খাতভিত্তিক ১১টি সংস্কার কমিশন গঠন করেন। এসব কমিশন সংবিধান, নির্বাচন, পুলিশ, বিচারব্যবস্থা ও দুর্নীতি দমনের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশ পেশ করে।
জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের গঠন
সংস্কার প্রক্রিয়ায় রাজনৈতিক দলগুলোর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে জাতীয় ঐকমত্য কমিশন গঠন করা হয়। সাত সদস্যের এই কমিশন তিন ধাপে মোট ৭২ দিন রাজনৈতিক দল, নাগরিক সমাজ, বিশেষজ্ঞ ও বিভিন্ন অংশীজনের সঙ্গে আলোচনায় বসে। আলোচনায় ১৬৬টি বিষয়ের ওপর মতবিনিময় হয় এবং ধাপে ধাপে বিভিন্ন বিষয়ে দলগুলো ঐকমত্যে পৌঁছে।
জুলাই সনদের চূড়ান্ত প্রণয়ন
২৮ জুলাই কমিশন জুলাই সনদের খসড়া তৈরি করে রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে পাঠায়। তাদের মতামত সংযোজন করে ১১ সেপ্টেম্বর চূড়ান্ত খসড়া প্রস্তুত করা হয় এবং ১৭ অক্টোবর জাতীয় সংসদের দক্ষিণ প্লাজায় আনুষ্ঠানিকভাবে জুলাই সনদ ২০২৫–এ স্বাক্ষর সম্পন্ন হয়। যদিও বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া নিয়ে কিছু মতভেদ ছিল, তারপরও অধিকাংশ দল গণতান্ত্রিক পুনর্গঠনের স্বার্থে এই সনদে স্বাক্ষর করে।
স্বাক্ষরে অংশগ্রহণকারী দলসমূহ
৩০টি আমন্ত্রণপ্রাপ্ত দলের মধ্যে ২৫টি দল সনদে স্বাক্ষর করে। উল্লেখযোগ্য দলগুলোর মধ্যে ছিল—বিএনপি, নাগরিক ঐক্য, জেএসডি, গণসংহতি আন্দোলন, আমার বাংলাদেশ পার্টি, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশসহ আরও অনেক দল। কয়েকটি দল যেমন এনসিপি, সিপিবি, বাসদ, জাসদ—সনদে স্বাক্ষর করেনি এবং সংবিধানের মৌলিক নীতি পরিবর্তনের আশঙ্কা প্রকাশ করে।
জুলাই সনদের মূল প্রতিশ্রুতি
সনদে মোট ২৮টি প্রতিশ্রুতি অন্তর্ভুক্ত আছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো—
- সংবিধান সংস্কারের স্পষ্ট নির্দেশনা
- রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে সংসদের উভয় কক্ষের ভোট
- রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানসমূহকে দলীয়করণমুক্ত করার প্রতিশ্রুতি
- নির্বাচন কমিশনের স্বাধীনতা
- তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার পুনর্বিন্যাস
- দুই কক্ষ বিশিষ্ট সংসদ প্রতিষ্ঠা
- স্থানীয় সরকারের স্বায়ত্তশাসন
- জরুরি অবস্থা ঘোষণার ক্ষমতা সীমিতকরণ
- মৌলিক অধিকার সম্প্রসারণ
এসব প্রতিশ্রুতি ভবিষ্যৎ সরকারকে সাংবিধানিকভাবে কাঠামোগত পরিবর্তন কার্যকর করার দিকনির্দেশনা দেয়।
সমালোচনা ও সীমাবদ্ধতা
যদিও সনদটি গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ, তবে স্বাস্থ্য, শিক্ষা, নারী অধিকার, শ্রম অধিকার ও অর্থনীতি সম্পর্কিত সুপারিশ অনুপস্থিত থাকায় ব্যাপক সমালোচনা উঠে। স্বাস্থ্যখাত সংস্কার কমিশনের গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশগুলো সনদে প্রতিফলিত হয়নি। অর্থনীতি ও আর্থিক খাতে কাঠামোগত দুর্বলতা নিরসনের নীতিমালা অনুপস্থিত। এছাড়া ২০২৪ সালের কোটা আন্দোলনের পটভূমিতে শিক্ষা বৈষম্য মোকাবিলার প্রশ্নটিও উপেক্ষিত হয়েছে।
রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া
বিএনপি সনদটির প্রতি আংশিক সমর্থন জানালেও এটি সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়ে আপত্তি তোলে। অন্যদিকে এনসিপি, সিপিবি ও বাম দলগুলোর অভিযোগ—সনদে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিকৃত করা হয়েছে এবং সংবিধানের ভিত্তি দুর্বল করার চেষ্টা করা হয়েছে। তবে সমর্থনকারী দলগুলো মনে করে—জুলাই সনদ রাজনৈতিক সংঘাতের অবসান এবং কাঠামোগত সংস্কারের পথনকশা।
গণভোটের সুপারিশ
রাষ্ট্রীয় বৈধতা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে জাতীয় ঐকমত্য কমিশন সনদ বাস্তবায়নের জন্য গণভোট আয়োজনের সুপারিশ করে। এতে জনগণের প্রত্যক্ষ সম্মতির ভিত্তিতে সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠনের প্রস্তাবও রয়েছে। পরিষদ ২৭০ দিনের মধ্যে সংবিধান পরিবর্তনের কাজ সম্পন্ন করবে বলে উল্লেখ করা হয়।
জুলাই সনদের তাৎপর্য
সনদটি মূলত রাষ্ট্রের ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ ভাঙা, স্বচ্ছতা প্রতিষ্ঠা, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানের পুনর্গঠন এবং জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার দিকনির্দেশনা প্রদান করে। এটি বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথম এমন চুক্তি যেখানে বিভিন্ন মতাদর্শের দল এক প্ল্যাটফর্মে এসে রাষ্ট্র পুনর্গঠনে ঐকমত্য তৈরি করেছে।
উপসংহার
সর্বোপরি, জুলাই সনদ ২০২৫ বাংলাদেশের রাজনৈতিক উত্তরণের একটি নতুন দুয়ার উন্মুক্ত করেছে। যদিও এতে কিছু সীমাবদ্ধতা বিদ্যমান, তবুও গণতন্ত্র, জবাবদিহি, স্বচ্ছ ও দল–নিরপেক্ষ রাষ্ট্রব্যবস্থা পুনর্গঠনের ক্ষেত্রে এটি একটি যুগান্তকারী নথি। সনদের সফল বাস্তবায়ন নির্ভর করবে ভবিষ্যৎ সরকারের সদিচ্ছা, জনগণের অংশগ্রহণ এবং নীতির প্রতি সকল দলের অটল প্রতিশ্রুতির ওপর। বাংলাদেশ যদি সনদের মূল্যবোধ ও নীতিগুলো বাস্তবে রূপ দিতে পারে, তাহলে এটি হতে পারে সত্যিকারের “নতুন বাংলাদেশের” ভিত্তিপ্রস্তর।